কৃষি থেকে শিল্প

মুন্সিগঞ্জের অর্থনৈতিক রূপান্তর

মুন্সিগঞ্জের শিল্পায়নের আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং। বিশেষায়িত শিল্প পার্ক তৈরির উদ্যোগ এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। কৃষি যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও শিল্প যন্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মাধ্যমে এ শিল্প কৃষি ও উৎপাদন খাতের মধ্যে তৈরি করতে পারে নতুন সংযোগ।

ভোরের আলো ফুটতেই মুন্সিগঞ্জের গ্রামীণ সড়কে শুরু হয় কৃষিপণ্য নিয়ে মানুষের ছুটে চলা। কোথাও আলুর বস্তা ভরে ট্রাক ছুটছে, কোথাও ব্যস্ত আড়ত, আবার কোথাও মাঠ থেকে উঠছে নতুন ফসল। এ চিত্রের পাশেই এখন দেখা যায় শিল্পকারখানার ধোঁয়া, নদীতে পণ্যবাহী নৌযানের চলাচল কিংবা নতুন শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ। একসময় যে মুন্সিগঞ্জের অর্থনীতির প্রধান পরিচয় ছিল কৃষি, সে জেলার অর্থনৈতিক ভূগোল এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃষিকে ভিত্তি করেই সেখানে বিস্তৃত হচ্ছে শিল্প, ব্যবসা, পরিবহন ও সেবা খাত।

ঐতিহাসিক বিক্রমপুরের এ জনপদের অর্থনীতির শেকড় অবশ্য এখনো মাটিতে। বিশেষ করে আলু উৎপাদন মুন্সিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ছয়টি উপজেলায় ৩৪ হাজার ৭৫৮ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৬০ হাজার ১১৯ টন। গত বছরের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার টন।

আলুর এ বিপুল উৎপাদনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় একটি অর্থনৈতিক চক্র। কৃষকের জমি থেকে ফসল ওঠার পর সেটি যায় আড়ত, হিমাগার ও পাইকারি বাজারে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বীজ, সার, কৃষি যন্ত্র, শ্রমিক, পরিবহন ও বিপণন। ঢাকার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে মুন্সিগঞ্জের কৃষিপণ্যের বড় একটি বাজারও রাজধানী। ফলে কৃষি শুধু জেলার মানুষের জীবিকার উৎস নয়, স্থানীয় বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানেরও বড় ভিত্তি।

কিন্তু উৎপাদনের সাফল্যের মধ্যেই দেখা দিয়েছে আরেক সংকট—সংরক্ষণ। জেলায় ৭৪টি হিমাগার থাকলেও সচল রয়েছে ৫৮টি। এসব হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার টন। অথচ চলতি মৌসুমে আলু উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি। ফলে উৎপাদিত আলুর বড় একটি অংশ হিমাগারের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে মৌসুমের সময় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমার ঝুঁকি তৈরি হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।

এ পরিস্থিতি মুন্সিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিকে পরবর্তী ধাপে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। শুধু উৎপাদন নয়, আলুকে প্রক্রিয়াজাত করে মূল্যসংযোজনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এমন শিল্প গড়ে উঠলে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্টার্চসহ বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালে পরিণত হতে পারে আলু। এতে কৃষকের বাজার সম্প্রসারণ হবে, একই সঙ্গে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পের সুযোগ।

মুন্সিগঞ্জের শিল্পায়ন যদিও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণেই থেমে নেই। মুক্তারপুরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিমেন্ট শিল্পাঞ্চল। শাহ্ সিমেন্ট, ক্রাউন সিমেন্ট ও প্রিমিয়ার সিমেন্টের মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে উৎপাদন করছে। ধলেশ্বরী ও মেঘনার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্পও। নদীপথে কাঁচামাল পরিবহন ও উৎপাদিত পণ্য সরবরাহের সুবিধা এ অঞ্চলের ভারী শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শিল্পায়নের নতুন কেন্দ্র হিসেবে সামনে আসছে গজারিয়া। ২১৬ একরের বেশি জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা আব্দুল মোমেন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো শুধু কারখানা স্থাপনের জায়গা নয়; এগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন, গুদাম, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সেবার একটি বড় নেটওয়ার্ক। ফলে শিল্পের সরাসরি কর্মসংস্থানের বাইরেও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর বহুমুখী প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।

মুন্সিগঞ্জের শিল্পায়নের আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং। বিশেষায়িত শিল্প পার্ক তৈরির উদ্যোগ এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। কৃষি যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও শিল্প যন্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মাধ্যমে এ শিল্প কৃষি ও উৎপাদন খাতের মধ্যে তৈরি করতে পারে নতুন সংযোগ। একই সঙ্গে স্থানীয় শ্রমবাজারও ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভরতা থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভরতার দিকে যেতে পারে।

ঢাকার শিল্প পুনর্বিন্যাসের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে মুন্সিগঞ্জ। পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম, প্লাস্টিক ও মুদ্রণ শিল্পকে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগের অংশ হিসেবে জেলায় বিসিকের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প কার্যকর হলে মুন্সিগঞ্জে শিল্পের ঘনত্ব আরো বাড়বে। এর সঙ্গে আবাসন, পরিবহন, খাবার, খুচরা ব্যবসা ও অন্যান্য সেবা খাতও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এরই মধ্যে পদ্মা সেতু বদলে দিয়েছে জেলার অর্থনৈতিক অবস্থান। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতুর কারণে রাজধানী এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ দ্রুত হয়েছে। লৌহজং, শ্রীনগর ও সিরাজদিখান এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। মাওয়া এখন শুধু ফেরিঘাট নয়; রেস্তোরাঁ, পর্যটন ও বিভিন্ন সেবার নতুন কেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে মুন্সিগঞ্জের অবস্থানগত গুরুত্বও বেড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রবাসী আয়। ইতালি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত জেলার মানুষের পাঠানো অর্থ স্থানীয় ভোগ, নির্মাণ, ব্যবসা ও বিনিয়োগে ভূমিকা রাখছে। ফলে কৃষি, শিল্প ও প্রবাসী আয়—এ তিনটি প্রবাহ মিলেই তৈরি হচ্ছে জেলার নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি।

আরও